ENGLISH  |  ARABIC  |  NNBDJOBS  |  BLOG
ব্রেকিং নিউজ

এনএনবিডি২৪ ডেস্ক

১১ জুন ২০২১, ১১:০৬

একটা মানুষের জীবন কতই না অদ্ভুত হয়!

18301_pp.jpg
ছবি- সংগৃহীত
সময়টা ১৯৫৩। ভারত নামে একটা নতুন দেশ হয়েছে। পূর্ব পাকিস্তান আর পশ্চিম পাকিস্তানের মাঝে এই দেশে তখন হিন্দুরা ছুটছে। সাম্প্রতিক দাঙ্গা আর দারিদ্রতায় তারা জর্জরিত।

এরকমই একটা পরিবার বরিশাল থেকে পরিবারসহ ছুটলো ভারতে। তারা সবাই বাঙালী। সেখানে সরকারী রিফিউজি হিসেবে কিছুদিন থাকার পর তাদের নাম কাটা যায়।

খাবারের তাড়নায় বাবা যাদবপুর জেতেন বিনা টিকেটে ট্রেনে। একদিন সেও না খেয়ে খেয়ে কাজ করায় অসুস্থ্য হয়ে পড়লেন। ছ’বছরের একটা একটা বোন তার শুধুমাত্র না খেতে পেয়ে চোখের সামনে ছটফট করতে করতে মরে গেলো। তার জীবনে ফিরে আসার কোন উপায় ছিলোনা।

পুলিশকে চাকরীর প্রোমোশন নিতে মাসে একটা সংখ্যক কেস দিতে হয়। তারা সেই কেসের কোটা পূরণ করতো রেল স্টেশনে শুয়ে থাকা ঘরবাড়িহীন মানুষকে ধরে নিয়ে বিভিন্ন চুরি চামারির কেস দিয়ে। তাকেও ধরতো। তবে এবার ভিন্ন কিছু ঘটলো। পুলিশ বড় একটা কেস ঝুলিয়ে দিলেন তার উপর। ভারতীয় বিধির ১৫৮,১৫৯ এবং ৩০৭ ধারার কঠিন দন্ড। জেলখানায় পচে মরার একটা উপায় খুলে গেলো।

জেলখানায় সে সারাদিন কাদে। আরেক কয়েদী ভদ্রলোক তাকে কাছে টেনে তার সম্পর্কে জানলেন। তাকে বুদ্ধিও দিলেন যেন সে জেলখানাতেই থাকে। কারণ এখানে অন্তত খাওয়া জুটবে। শুধুমাত্র খাওয়ার আশায় তিনি পড়ে রইলেন জেলখানায়। যদিও জেল থেকে তাকে বের করার মত কেউ ছিলোওনা।

সেই কয়েদী তাকে বললেন, আয় তোকে ক খ গ শিখাই। চক নেই, স্লেট নেই, পেন্সিল নেই কিভাবে শিখবেন? তিনি জেলখানার উঠোনে কাঠের টুকরো দিয়ে দাগ কেটে জীবনের প্রথম পড়ালেখা শিখলেন। জেলে বসে এভাবে বাংলা পড়া শিখলেন। যা হয়তোবা জেলখানার বাইরে তিনি কখনই শিখতে পারতেন না। জেলখানার ছোট্ট লাইব্রেরীতে বসে বসে বানান করে বই পড়লেন।

জীবনে খাওয়া ছাড়া আরেক কাজেও যে আনন্দ আছে তা তিনি প্রথম জানলেন। সেটা হলো বই পড়া। জেল থেকে বেরিয়ে রিক্সা চালান। মোটামুটি খেয়ে বাঁচেন।

সেই রিক্সায় একদিন একজন উঠলেন। আর তার জীবনটাই বদলে গেলো। ইউনিভার্সিটির সামনে রিক্সা রাখলে অনেক শিক্ষকরা রিক্সায় ওঠেন। সেদিনও তাই ঘটেছিলো। তিনি ভাবলেন, মনে জমে থাকা প্রশ্নটা তবে তাকেই করা যাক। তিনি রিক্সা চালাতে চালাতে প্যাসেঞ্জার ভদ্রমহিলাকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘আপনি কী বলতে পারেন জিজীবিষা অর্থ কী? আমি এটার অর্থ জানিনা।‘

রিক্সাওয়ালার মুখে এত কঠিন শব্দ শুনে একটু অবাক হবারই কথা। তিনিও শুধালেন এই শব্দ কোত্থেকে জেনেছেন উনি। তিনি জানালেন তিনি বই পড়তে পড়তে এই শব্দটা পেয়েছেন। কিন্তু অর্থ জানেন না বলে বুঝতে পারছেন না। এই রিক্সাওয়ালা বইও পড়ে! জিজ্ঞেস করলেন, আপনার নাম কী? তিনি বললেন, মনোরঞ্জন ব্যাপারী। লেখাপড়া কতদূর করেছেন জানতে চাইলেন ভদ্রমহিলা। তিনি জানালেন, কখনো স্কুলে জাননি। নিজে নিজে কিছু বানান শিখে বই পড়েন।

মনোরঞ্জন ব্যাপারীর হাতে নাম ঠিকানার চিরকুট ধরিয়ে যোগাযোগ করতে বলে চলেন তিনি। তিনি ছিলেন মহাশ্বেতা দেবী।

জীবনে কোনদিন কিছু না লেখা মনোরঞ্জন ব্যাপারী মহাশ্বেতা দেবী হাত ধরে লিখলেন একের পর এক অদ্ভুত সুন্দর লেখা।

জীবনের খেই হারিয়ে ফেলা এক মনোরঞ্জন লিখে গেছেন চল্লিশ বছর। বাংলা আকাদেমী সহ পেয়েছেন বহু সাহিত্য সম্মাননা। বাতাসে বারুদের গন্ধ, বৃত্তের শেষ পর্ব, জিজীবিষার গল্প, চণ্ডাল জীবন সহ লিখেছেন অনেক বিখ্যাত বই। ইংরেজি ভাষায় অনুবাদ হচ্ছে তার আত্মজীবনী। শুধুমাত্র বই পড়া একটা মানুষের জীবন এত অদ্ভুত ভাবে মোড় নিতে পারে? ভাবা যায়?

জীবনে বহু মানুষকে সামনাসামনি দেখার স্বপ্ন আমি দেখি। তার মধ্যে উনি ছিলেন একজন। ভাবতাম, যেদিন কোলকাতায় যেতে পারবো সেদিন হয়তোবা খুব কাছ থেকে উনাকে দেখবো। খুব তীব্র ইচ্ছে! কিছুদিন আগে বিশেষ আমন্ত্রনে মনোরঞ্জন ব্যাপারী এসেছিলেন ঢাকায়। আমি আমার ছোট্ট নোটপ্যাড নিয়ে উনার সামনে মেলে ধরেছিলাম তার অটোগ্রাফ নেবার জন্য।

উনি এক দলিত জীবন নিয়ে জেলখানার ফ্লোরে বসে শেখা হাত থেকে টুকটুকে অক্ষরে লিখলেন- ‘দাদাভাই জুবায়েরকে অসংখ্য ধন্যবাদ’। বিশ্বাস করেন এই লেখাটার কী যে শক্তি!

লেখক: জুবায়ের ইবনে কামাল